ফরিদ আহমেদ রবি
দেশের সবচেয়ে উন্নত জেলা সমূহের অন্যতম নারায়ণগঞ্জ। ভৌগোলিক এবং বিভিন্ন অবকাঠামো জনিত সুবিধার কারণে নারায়ণগঞ্জের এ অবস্থান। সুলতানি আমল, মোগল আমল, ব্রিটিশ শাসনামল সব সময়ই নারায়ণগঞ্জ শাসক মহলের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। তাই দেশের প্রাচীনতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে নারায়ণগঞ্জের অবস্থান মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আজ অব্দি স্বমহিমায় উজ্জ্বল। নগরায়নের ক্ষেত্রেও ঢাকার আগেই নারায়ণগঞ্জ নাগরিক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, এমনটিই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের অন্তর্গত সোনারগাঁ সবিশেষ পরিচিত। সুলতানি আমলে ঢাকা ছিল সোনারগাঁ তথা নারায়ণগঞ্জের একটি জেলা বিশেষ। বাংলার রাজধানী থাকাকালীন সময়ে সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সূচনা। ইতিহাস বিদদের প্রচেষ্টায় বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের অন্যতম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব চিহ্নিত হয়েছে মোগরাপাড়া অঞ্চলে। উপমহাদেশের প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও এ শিক্ষাঙ্গণের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে সব ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ এখনো সমৃদ্ধির পানে এগিয়ে চলেছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, পাশাপাশি বেশ কিছু ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ হারিয়েছে তার স্বীয় ঐতিহ্য। এখনও যা কিছু অবশিষ্ট আছে তাও বিলুপ্তির পথে। অর্থকরী শিল্পের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মত হলেও সৃজনশীল শিল্প একই গতিতে নি¤œমুখী। অপরিকল্পিত বালিজ্যমুখী শিল্পের ঊর্ধ্বগতি দিন দিন কেড়ে নিচ্ছে নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক গতি। অথচ পরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ন, নারায়ণগঞ্জকে দিতে পারতো অর্থকরী শিল্পের পাশাপাশি সৃজনশীল শিল্প সমৃদ্ধ একটি আধুনিক অঞ্চলের মর্যাদা । দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জে পরিবেশ দূষণের মাত্রা সব সূচক ছাড়িয়ে গেছে। পরিবেশ দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। অথচ ছোট্ট একটি নগর রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর অসংখ্য ভারী শিল্পের উপস্থিতি স্বত্বেও পরিবেশ বান্ধব একটি দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃত। সিঙ্গাপুরের অবস্থান চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পরিবেশ দূষণ শুধু শিল্পকারখানার জন্য নয় বরং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবও এজন্য সমানভাবে দায়ী। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য যা যা করণীয় তার সবকটি মেনে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় বলে সিঙ্গাপুরকে এ অপবাদ সইতে হয় না। ছোট্ট দেশটিতে জলবায়ু সংক্রান্ত পরিবেশ রক্ষায় সবুজায়ন রক্ষা করা হয় সব সূচক মেনে। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শিল্পকারখানা সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জকেও বসবাসযোগ্য আধুনিক শহরে পরিণত করা অসম্ভব নয়। বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যের অধিকারী নারায়ণগঞ্জ দেশকে শুধু দিয়েই চলেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে একক জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের অবদান সর্বোচ্চ হলেও প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সব সময় নারায়ণগঞ্জ বঞ্চিতই থেকে যায়। অধিক অপরাধ প্রবণ এলাকা হিসেবেও নারায়ণগঞ্জের কপালে উঠেছে কলঙ্ক তিলক। ক’দিন পরপর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকান্ড এবং লাশ প্রাপ্তি যেন একেবারেই সাধারণ একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অন্য জেলার অপরাধীরা তাদের অপরাধ কর্ম সম্পাদনের জন্য নারায়ণগঞ্জকে বেছে নেয়। বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত হত্যাকান্ডের লাশও এখানেই শনাক্ত হয়। নিয়মিত চুরি-ডাকাতি, হানাহানি, চাঁদাবাজি রাহাজানি, ছিনতাই এর ঘটনা তো রয়েছেই। এসব কিছুই প্রমাণ করে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিচে নেমে গেছে। এখানে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। স¤প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটির মাননীয় মেয়র এ ব্যাপারে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়েছেন এবং যথারীতি আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য তার প্রতিপক্ষের দিকেও তীর নিক্ষেপ করেছেন। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মাননীয় এমপি মহোদয় কয়েকদিন আগে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, এক্ষেত্রে তার পরিবারের নাম ভাঙ্গিয়ে যারা অপকর্মে লিপ্ত তাদের প্রতিও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উচ্চারণ করেছেন। তাদের উভয়ের বক্তব্যেই নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলার অবনতির স্বীকৃতি রয়েছে। পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা নারায়ণগঞ্জকে আইনশৃঙ্খলা জনিত অবনতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে খুব সহজেই। যে জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উপমহাদেশের প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সেই জেলাটিতে আজ অব্দি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলোনা, ভাবতেই অবাক লাগে! দীর্ঘদিন দাবি জানানো স্বত্তে¡ও একটি মেডিকেল কলেজ নারায়ণগঞ্জবাসীর স্বপ্নেই রয়ে গেল! এসব দাবির ক্ষেত্রে অনেকেই বলে থাকেন, ঢাকার একেবারেই নিকটস্থ হওয়ায় এসব অবকাঠামো নারায়ণগঞ্জে খুব বেশি প্রয়োজন নেই। অদ্ভুত যুক্তি! ঢাকা শহরের ভেতর একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ রয়েছে, কই সেক্ষেত্রে তো এমনটি বলা হয় না ‘এসব প্রতিষ্ঠান ঢাকায় দরকার নেই’! এ ধরনের প্রতিষ্ঠান মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নয় বরং শিক্ষার উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার জন্যই প্রয়োজন। নারায়ণগঞ্জের মত জনবহুল একটি শহরে বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি না বোঝেন তাহলে একথা বলতেই হয়, প্রয়োজন, অপ্রয়োজনের তাৎপর্য তারা জানেন না। অবশ্য নারায়ণগঞ্জবাসী দীর্ঘদিন যাবত শুনে আসছে, এখানে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।স¤প্রতি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জবাসীর আতঙ্কের জায়গাটা একটু ভিন্নতর। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মের প্রতিশ্রæতি, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সত্তে¡ও বেশ কিছু কাজের প্রাথমিক ধাপ এখনও অধরাই রয়ে গেছে। তাই ভয় হয় এ সমস্ত প্রতিশ্রæতি শুধু কাগজে-কলমেই থাকবে না তো! জেলার প্রাণকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ শহরে যানজট একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুয়ারেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সেবা দিতে অক্ষম। শহরের বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণসহ সার্বিক পরিবেশ নগরবাসীর জন্য অসহনীয় এবং স্বাস্থ্যহানী থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবন যাপনের প্রধান অন্তরায়। সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়া সত্তে¡ও নারায়ণগঞ্জ শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ সমস্ত অসুবিধা দূরীকরণ এবং নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির চাহিদা নিশ্চয়ই নারায়লগঞ্জবাসীর অনধিকার চর্চা নয়। মাসে মাসে বিল পরিশোধ করতে হলেও ওয়াসার পানি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য এক আরাধ্য ধন হিসেবেই বিবেচিত। আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস প্রাপ্তিতো সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে, অথচ মাস শেষে বিল পরিশোধের জন্য গ্যাস না পাওয়া গ্রাহকদের ছুটতে হয় ব্যাংকের দুয়ারে, নয়তো জরিমানা এবং লাইন কাটার ভয় থেকে যায়। সা¤প্রতিককালে দেশের অবকাঠামোগত বিভিন্ন উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। এমন অবকাঠামোগত উন্নয়নে নারায়ণগঞ্জের প্রাপ্তি কতটুকু এবং তা পর্যাপ্ত কিনা এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকেই যায়। যা কিছু উন্নয়ন হয়েছে তার চেয়ে আরও বেশি উন্নয়নের প্রয়োজন এবং সুযোগ ছিল কিনা তাও বিবেচনার দাবি রাখে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নারায়ণগঞ্জের অসাধারণ ভূমিকা থাকা সত্তে¡ও সচেতন মহল মনে করেন, পরিকল্পিত উপায়ে নারায়ণগঞ্জের অবকাঠামোগত এবং ভৌগোলিক সুবিধাদি কাজে লাগাতে পারলে নারায়ণগঞ্জ দেশ ও জাতিকে আরো অনেক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সাহায্য করতে পারে। অমিত সম্ভাবনার নারায়ণগঞ্জ এখনো অনেক বড় অবদান রাখার যোগ্যতা রাখে। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়ন। সচেতন মহল এও মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে নারায়ণগঞ্জের সম্ভাবনাময় সবকটি ক্ষেত্র এখনো সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। যত্রতত্র শিল্পায়ন এবং আবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করে উপযুক্ত স্থানে এ সমস্ত অবকাঠামো নির্মাণের যথেষ্ট সুযোগ এখনো রয়েছে। এ সমস্ত সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষা করেও নারায়ণগঞ্জ শিল্প বাণিজ্যে আরও অবদান রাখতে পারে। ৫টি বড় বড় নদ-নদী পরিবেষ্টিত নারায়ণগঞ্জের নদী তীরবর্তী অঞ্চল সমূহে শিল্পায়ন এবং উপযুক্ত স্থানে আবাসন প্রকল্প স্থাপন করা গেলে নারায়ণগঞ্জবাসীর নাগরিক সুবিধা যেমন বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশ দূষণ থেকেও মুক্তি পাবে এলাকাবাসী । নাগরিক সুবিধা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ন এবং চিকিৎসা শিক্ষাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জকে সমৃদ্ধ করা গেলে তা শুধু নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না জাতীয় কল্যাণেও যোগ হবে ভিন্ন মাত্রা। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন,সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক কাজ নারায়ণগঞ্জে কেন হয় না এবং হলেও তা কেন পর্যাপ্ত নয়, এমন সব প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলে থাকেন, নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, কোন কোন ক্ষেত্রে অন্তর্কলহ এজন্য দায়ী। নারায়ণগঞ্জের জনপ্রতিনিধিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে যে অন্তর্কলহ রয়েছে তা গোপন কিছু নয়। নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিগণ যথেষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন, বিচক্ষণ এবং সরকারের উচ্চ মহলে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম বলেই বিবেচিত। তারপরও কেন তারা সার্বিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারছেন না বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বিস্ময়কর। সাধারণ মানুষের ধারণা নারায়ণগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় শীর্ষ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বিভেদ। এই বিভেদ কাটিয়ে উঠতে পারলে নারায়ণগঞ্জ তার প্রাপ্য সবকিছুই অর্জন করতে পারবে। নারায়ণগঞ্জের আপামর জনসাধারণ এবং জাতীয় স্বার্থে নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ নেতৃত্ব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হবেন, নারায়ণগঞ্জবাসী তেমনটিই চায়। শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠবে পরিবেশবান্ধব, অপরাধমুক্ত একটি আধুনিক জেলার দৃষ্টান্ত। নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এলাকাবাসীর এই চাহিদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এগিয়ে আসবেন তেমনটি আশা করাই স্বাভাবিক।
লেখকঃ বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা
গোপনীয়তা নীতি | এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।